জানুয়ারি-জুন

প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতি ১০০ বিলিয়ন ডলার

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলারে।

পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান সুইস রে সম্প্রতি এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ কমেছে, তবে এতে দুর্যোগের ঝুঁকি কমেনি। খবর জাপান টুডে।

প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, জানুয়ারি-জুন পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিশ্বে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় শত বিলিয়ন ডলার। গত বছরের একই সময় এ ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ২০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ক্ষতি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।

সুইস রের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের প্রথমার্ধের ক্ষতি গত ১০ বছরের একই সময়ের গড়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কম। যুক্তরাষ্ট্রে শক্তিশালী ঝড় ও জুনে ভেনিজুয়েলায় প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের মতো বড় দুর্যোগ ঘটলেও সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ গত বছরের তুলনায় অনেক কম ছিল।

বছরের দ্বিতীয়ার্ধ (জুলাই-ডিসেম্বর) নিয়ে সতর্ক করেছে সুইস রে। সাধারণত বছরের শেষ ছয় মাসে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের ঘূর্ণিঝড় এক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি তৈরি করে।

সুইস রের ক্যাটাস্ট্রফি পারিলস বিভাগের পরিচালক বালজ গ্রোলিমুন্ড বলেন, ‘বছরের প্রথমার্ধে ক্ষতি কম হয়েছে বলে ঝুঁকি চলে গেছে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। একটি বড় ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প বা দাবানল খুব দ্রুত পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউরোপে এরই মধ্যে আবহাওয়ার পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে। জুন থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তীব্র গরম পড়েছে। এর প্রভাবে ফ্রান্স ও স্পেনে স্বাভাবিক সময়ের আগেই দাবানলের মৌসুম শুরু হয়েছে। এসব দাবানলে হাজার হাজার বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়েছে।

সুইস রের মতে, বিশ্বজুড়ে আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের মধ্যে দাবানল সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা ঝুঁকিগুলোর একটি। ১৯৭০ সালের পর থেকে ইউরোপে দাবানলে বীমার আওতায় থাকা ক্ষতি মূল্যস্ফীতি ও অন্যান্য প্রভাব সমন্বয়ের পর প্রতি বছর গড়ে ৮-১১ শতাংশ হারে বেড়েছে।

এ পরিস্থিতির সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, দীর্ঘতর উষ্ণ মৌসুম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মানুষের বসতি বাড়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে একটি দুর্যোগ ঘটলে আগের তুলনায় বেশি বাড়িঘর, ব্যবসা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝার জন্য গত বছরের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ। সুইস রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগে মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি ডলার। এর মধ্যে বীমার আওতায় ছিল ১০ হাজার ৭০০ কোটি ডলার।

২০২৫ সালে বীমার আওতায় থাকা ক্ষতির বড় অংশ এসেছিল দাবানল, তীব্র বজ্রঝড় ও বন্যার মতো ‘সেকেন্ডারি পারিলস’ থেকে। ২০২৫ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বীমার আওতায় যত অর্থ ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছিল, তার ৯২ শতাংশই ছিল দাবানল, তীব্র ঝড় ও বন্যা।

লস অ্যাঞ্জেলেসের দাবানলও এতে বড় ভূমিকা রাখে। ওই দাবানলে ক্ষতিপূরণ প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছিল, যা কোনো একক দাবানলের ক্ষেত্রে রেকর্ড।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নিয়ে সুইস রের পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, বিশ্বে বীমা করা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতিপূরণ দীর্ঘমেয়াদে প্রতি বছর গড়ে ৫-৭ শতাংশ হারে বাড়ছে। এর পেছনে শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তন দায়ী নয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বাড়িঘর, কারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সম্পদের পরিমাণও বাড়ছে।

সামনের দিনগুলোয় এল নিনো পরিস্থিতিও নজরে রাখছে সুইস রে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনে বলা হয়, জুনে শুরু হওয়া এল নিনো বছরের শেষ দিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে। ফলে আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ক্ষতি আরো বাড়তে পারে।

এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়ের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বের অন্য অঞ্চলে বন্যা, দাবানল ও অন্যান্য চরম আবহাওয়ার ঝুঁকিও বদলে দিতে পারে। তাই বছরের প্রথমার্ধে ক্ষতি কম হওয়ার পরও দ্বিতীয়ার্ধে বড় কোনো দুর্যোগের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না বলে জানান প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি শুধু সরকার বা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ওপর চাপ তৈরি করে না। এর বড় প্রভাব পড়ে বীমা খাতেও। কোনো বড় দুর্যোগে হাজার হাজার বাড়ি, গাড়ি, কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হলে বীমা কোম্পানিগুলোকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এসব ঝুঁকির একটি অংশ পুনর্বীমা কোম্পানিগুলোর কাছে স্থানান্তর করা হয়।

সুইস রে এ ধরনের পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান। সাধারণ বীমা কোম্পানির ঝুঁকির একটি অংশ পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান বহন করে। ফলে বড় দুর্যোগের সময় পুরো বীমা খাতের আর্থিক চাপ সামলাতে পুনর্বীমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সুইস রে আরো জানায়, ২০২৬ সালে বীমা করা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি প্রায় ১৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে। বড় কোনো দুর্যোগের বছর হলে তা ৩২ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আরও